ভাষা আন্দোলনঃ প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি

ইতিহাস থেকে হোক আর যেভাবে হোক এ কথা সকলে জানে যে, ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোষ্টেলের সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার দায়ে ছাত্রদের উপর পুলিশের বর্বোরচিত গুলি বর্ষনের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাষ্টার্সের ছাত্র মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন (২৬) ঘটনাস্থলে শহীদ হন। পরে আহতদের মধ্যে ঐদিন রাত ৮টার পর রফিক (২৭), বরকত (২৫), জব্বার (৩০) সহ আরো অনেকে মারা যান। পরবর্তীতে দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ থাকাবস্থায় সালাম মারা যান। এরপর থেকে সেই দিনকে আমরা প্রথম দিকে ‘শহীদ দিবস’ তারপর ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছি। পরবর্তীতে প্রবাসীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে এবং বিশ্বের প্রায় ২৮টি দেশের সমর্থনে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর এক সাধারণ সভায় ২১শে ফেব্রুয়ারির মাতৃভাষা দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরপর থেকে বিশ্বের প্রায় ১৮৮টি দেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন হয়ে আসছে।

প্রতি ইংরেজি পঞ্জিকায় ফেব্রুয়ারি মাস আসলে সবার মাঝে বাংলার প্রতি দরদ বেড়ে যায়। ফেব্রুয়ারি মাস আসলে তখন বাংলা হয় ‘আ মরি বাংলা ভাষা’। আর ফেব্রুয়ারি মাস চলে গেলে বাংলার আর হদিস পাওয়া যায় না। প্রতিবারে ১লা ফেব্রুয়ারি আসলে যারা যে মত ও পথের, তারা সে মত ও পথের ভিত্তিতে ‘একুশ’কে কাজে লাগাবার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। তখন বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে অনেক কিছুই হয়। টক শো থেকে শুরু করে বই মেলা। ফেব্রুয়ারি চলে গেলে কোথায় সেই টক শো আর কোথায় সেই বই মেলা! এসবের আর খোঁজ পাওয়া যায় না। তাহলে ভাষা আন্দোলনের প্রাপ্তি কি শুধুমাত্র এই একটি মাস?

৭১এ যে বাঙ্গালিরা পাকিস্তানি নরপশুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এই বাংলাদেশকে মুক্ত করেছিলেন তারা এর উৎসাহ, সাহস পেয়েছিলেন এই একুশের চেতনা থেকে। অথচ ভাষা আন্দোলনের এত বছর পরও ভাষা শহীদদের তালিকা করে তাদের প্রতি সম্মান দেখানো হয়নি, যেভাবে তালিকা করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। ভাষা শহীদদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোন কিছুই করা হয়নি। আজো পর্যন্ত তারা উপেক্ষিত। তাদের পরিবারকে কোন ধরণের সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছেনা। এ দুরবস্তা দেখে আমাদের লজ্জিত হতে হয়, কেননা তাদের জন্যই আমরা বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে পেয়েছি।

বাংলা ভাষার দুরবস্তা দেখে মুখ নিঁচু না করে পারিনা। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টে বাংলা ভাষা আজ উপেক্ষিত। হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিলেট বিভাগে ইংরেজি হলো একমাত্র ভাষা। বাংলা সেখানে অগ্রাহ্য। একটি মামলার সবকিছুই চলে ইংরেজিতে। হাইকোর্ট বিভাগের দু’জন বিচারপতি একবার একটি মামলার কোন এক পর্ব বাংলাতে করেছিলেন। কিন্তু অন্যান্যদের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রবন্ধকার সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) তাঁর “পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা” নামক প্রবন্ধে বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে শেষ পর্যন্ত বাঙ্গলা ভাষাই হবে সে সম্বন্ধে আমাদের মনে কখনো কোনো সন্দেহ ছিল না এবং একথাও নিঃসন্দেহে জানি যে যদিও এখনকার মত বাঙ্গলার দাবী মেনে নেওয়া হয়েছে তবু উর্দুওয়ালারা আবার সুযোগ পেলেই মাথা খাড়া করে উঠতে পারেন।” আসলে উনার কথা শেষ পর্যন্ত সঠিক হয়েছিল। উর্দুওয়ালারা ৭১এ আমাদের উপর নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছিল। উনার মত আমাদেরকে শংকিত হতে হয় কখন যে হিন্দিওয়ালারাও মাথা খাড়া করে উঠে। কারণ আমাদের দেশে বর্তমানে হিন্দির প্রভাব দেখে শংকিত হয়। বাংলা সিরিয়ালের পরিবর্তে হিন্দি সিরিয়াল নিয়েই ব্যস্ততা বেশি দেখা যায়। বাংলা গানের শ্রোতার চেয়ে হিন্দি গানের শ্রোতাই বেশি এখন বাংলাদেশে। এমনকি পোষাক-আশাকেও হিন্দির জয়জয়কার।

এমন অনেক বাংলাদেশি আছেন যাদের কাছে বাংলা ভাষার চেয়ে হিন্দি ভাষাকে বেশী ভালো লাগে। বিদেশের যেসব দেশে (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে) বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেশি ঐসব দেশে যে সমস্ত বাংলা স্কুল আছে সেখানে ঐ প্রবাসী বাংলাদেশিদের সন্তানদের পড়ান না! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পড়ান ইন্ডিয়ান স্কুলে! এর ফলে বাংলাদেশি ছেলে মেয়েরা বাংলার চেয়ে হিন্দির প্রতি আকর্ষিত হয় বেশি।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে আমরা বাংলা ভাষাকে আমাদের মাতৃভাষা হিসেবে পেয়েছি ঠিকই কিন্তু আমরা কয়জন জানি যে সেদিন বাংলা সনের কত তারিখ ছিল? (০৮ ফাল্গুন, ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)। আজ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি থেকে এমন একটি বাংলা অভিধান প্রকাশ করা হয়নি যে অভিধানে প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত সব শব্দ আছে।

Advertisements

About চাটিকিয়াং রুমান

সবসময় সাধারণ থাকতে ভালোবাসি। পছন্দ করি লেখালেখি করতে, আনন্দ পাই ডাক টিকেট সংগ্রহ করতে আর ফটোগ্রাফিতে, গান গাইতেও ভালবাসি। স্বপ্ন আছে বিশ্ব ভ্রমণ করার...।।

Posted on ফেব্রুয়ারি 24, 2012, in ইতিহাস and tagged , , , . Bookmark the permalink. 10 টি মন্তব্য.

  1. আমার মনে হয় না একটা ভাষা টিকে থাকে তার ঘিরে গড়ে ওঠা কোন নিয়ম কানুনে। ভাষা বিবর্তিত হয়,হয়েছে আর হবেও। আমি জানিনা হিন্দী ঠিক কতটুকু সমস্যা,যু‍দি হয় আমার প্রশ্ন হলো আমরা কেন প্রতিযোগিতায় পারছি না। এর কারন হয়তো বহুমাত্রিক। প্রতিটি ভাষা টিকে থাকে সেই ভাষার সৃষ্টিতে… আমাদের ভাষার এই অবহেলিত দিকটি দেখতে হবে আগে। এটি কোন রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ না। কোন দেশেই রাষ্ট্রযন্ত্র এতটা নমনীয় হতে পারেনা ভাষার দাবীকে তার অর্থনৈতিক বাস্তবতার ধারায় প্রবাহিত করতে। এটি সৃজনশীল মানুষদের দায়িত্ব। বাংলাভাষায় আমাদের অনেক কিছু সৃষ্টি করতে হবে। অনেক কিছু সৃষ্টি এখনো বাকী।

    • ভাষা টিকে থাকে তার আপন মহিমায়। ভাষা বিবর্তিত হয় ঠিক কিন্তু তার মৌলকে ব্যাহত করে নয়। হিন্দি কতটুকু সমস্যা সেটা আমাদের চারপাশে তাকালে বুঝা যাবে। হিন্দির সাথে প্রতিযোগিতায় আমরা কোন দিক দিয়ে পারছিনা সেটা একটু বিস্তারিতভাবে বললে সুবিধা হতো।

      হ্যাঁ, আমাদের ভাষাকে অবহেলার হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের। তবে রাষ্ট্রেরও এই ক্ষেত্রে দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে- অন্য কোন ভাষা/সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নিজ ভাষা/সংস্কৃতিকে রক্ষা করা।

      মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ হাসান ভাই।

      • ভাষা বিবর্তিত হয়েই এই বাংলা ভাষা এসেছে..যে কোন ভাষাই আসলে সেভাবে এসেছে। আমরা কেউই না চাইলেও ভাষা বিবর্তিত হবে। আমরা আসলে কোনটাকে মৌল বলবো আসলে, হয়তো তাত্ত্বিকভাবে বলা যেতে পারে, যা ব্যবহারিকভাবে অসম্ভব।

        আমি প্রায় ২০০৭ থেকে দেশে নেই, তাই হয়ত হিন্দির এই আগ্রাসনটি বুঝতে পারছি না আপনার মত করে। যদি হয়ে থাকেই তাহলে আমাদের বুঝতে হবে আমরা কেন পারছি ‍না, সেখানে সমস্যাটা কোথায়, আমিও এই প্রশ্নটা করেছি, সমাধান আমারও জানা নেই। গত চারদশক ধরেই আমাদের এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে অপরাধী বানাচ্ছি। কিন্তু অপরাধটা কেন ঘটছে সেটা না বুঝেই।

        আমি যতটুকু মনে করি সেটা হলো প্রতিযোগিতা করার মত আমাদের আগে কনটেন্ট বা বিষয়বন্তু তৈরী করতে হবে। কোন দেশেই সিংহভাগ মানুষ একই ভাবে সচেতন হয় না, যারা সচেতন তারাই তাদের নানা ক্ষেত্র থেকে এগিয়ে আসে, এই যে আপনি একটা বাংলা ব্লগ লিখছেন, সেটাও কিন্তু সেই দায়বদ্ধতা থেকেই। সব ভাষা বা সংস্কৃতি থেকে ভালো কিছু নেবার আছে, যে ভাষা সেটা পারে সেই ভাষা ততই শক্তিশালী হয়।

        আমার মনে হয় আরো বেশী বেশী বাংলাভাষায় আমাদের মানসম্পন্ন সৃজনশীল কাজ করতে হবে।
        শুধুই আমার মতামত রাষ্ট্র কিছু করতে পারেনা, কারন এই বিশ্বে রাষ্ট্র তাত্ত্বিকভাবে সার্বভৌম হলে ব্যাবহারিকভাবে না। দেশের সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ তাই নাগরিকদের করতে হবে, বাংলাদেশে সেটাই হচ্ছে কিন্তু। শুভকামনা।

  2. মন্তব্যের জন্য পুনরায় ধন্যবাদ হাসান ভাই।

    শুভ কামনা আপনার জন্য। ভালো থাকুন সবসময়।

  3. বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত সব শব্দ নিয়ে অভিধান বের করবে বাংলা “একাডেমী”?? নিজের নামের বানানটা-ও তো এতদিনে ঠিক করতে পারলো না :p :p

  4. তবুও বাঙ্গালী সব কিছু ভুলে আজ হিন্দি আর ইংরেজীর চাপে বাংলাকে হারিয়ে ফেলছে ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: