মরুর বুকে বায়ান্ন দিন: ১ম পর্ব

সবে মাত্র এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। হাতে প্রচুর সময়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৪ দিন পর আতাউর রহমান স্যার আসলেন আমাকে দেখতে। আতাউর রহমান স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন এখনো। তার পুত্রতুল্য মনে করেন। স্যার এসে আমার সাথে বেশ খানিক্ষণ গল্প করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন এই লম্বা সময়ে কী করার প্ল্যান করেছি। সোজা সাপ্টা উত্তরে বললাম, “কিছু করার প্ল্যান করিনি”। তখন স্যার বললেন, “এককাজ করো, আরব আমিরাত থেকে ঘুরে আস, যেহেতু সেখানে তোমার বাবার ব্যবসা আছে”। স্যারের বলা এই প্ল্যানটির কথা শুনে আমি তো ভেজায় খুশি। আরব আমিরাতে ভ্রমণে যাওয়ার ব্যাপারটা মাকে বললাম। মা রাজী হয়ে গেলেন এবং সেদিনই বাবাকে ফোন করে বিষয়টি জানালেন।

এর প্রায় ৫/৬ দিন পর বাবা আমাকে ফোন করে বললেন, “তোর জন্য ভিজিট ভিসা পাঠাবো, তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট তৈরি করে ফেল”। বাবা বিদেশ থেকে ট্র্যাভেল এজেন্সী ব্যবসায়ী উনার মামাতো ভাইকে ফোন করে আমার জন্য পাসপোর্ট বানানোর কথা বললেন। উনার সাথে যোগাযোগ করে একদিন পাসপোর্ট অফিসে গেলাম এ উদ্দেশ্যে। ৭ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট চেয়ে আবেদন করে সেই পাসপোর্ট পেলাম ১৭ দিনের মাথায়! পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম পাসপোর্ট তৈরি করা শেষ। এর প্রায় সপ্তাহ খানেক পর বাবা বাসায় ফোন করে জানালেন আমার জন্য ভিজিট ভিসা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

২৩শে মে’ ২০০৫ তারিখের টিকিট কাটা হয়েছে বাংলাদেশ বিমানের। বাবার মামাতো ভাইটি টিকেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন মূলত। এদিকে বাবা-মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। কারণ ঐ ফ্লাইটে আমাদের পরিচিত কেউ যাচ্ছেন না। পরিচিত কেউ গেলে আমার জন্য সুবিধা হতো- বাবা মা এটাই মনে করেছিলেন। যা হোক, বাসা থেকে মা-আপুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছোট মামা, দুলাভাই ও ছোট বোনকে সাথে করে বিমান বন্দরের দিকে রওনা দিলাম। কিন্তু সেদিন বিমান বন্দরে পৌঁছার পর দেখলাম আমাদের পরিচিত ২ জন যাচ্ছেন একই ফ্লাইটে। দু’জনই আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। একজন আমার মামা, আরেকজন আমার আপু হন।

বিমান বন্দরে আমাকে বিদায় জানাতে আসা ছোট মামা, দুলাভাই এবং ছোট বোনকে বিদায় জানিয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্র্যাশনের কাজ শেষ করে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছিলাম নির্দিষ্ট সময়ে বিমানে উঠার জন্য। বিমান বন্দরে আমাকে দেখে আমার সেই দূর সম্পর্কের মামা ও আপু সবসময় তাদের আশে-পাশে রেখেছিলেন আমাকে যাতে আমার কোনো অসুবিধা না হয়। পরে যখন বিমানে উঠার জন্য বলা হলো তখন বিমানে প্রবেশ করে দেখলাম আমার সিট পড়েছে একদম বামে জানালার পাশে এবং আমার ডান পাশের সিটটি পড়েছে সেই আপুটির। কিন্তু সেই মামাকে দেখলাম না। পরে বুঝতে পারলাম আমাদের সিটের জায়গাটি বিজনেস ক্লাসের। বাংলাদেশ সময় রাত ০৮:৪৫ মিনিটে বিমান ছেড়ে দিলো। বিমান ছাড়ার পর আমি আর আপু গল্প করলাম বেশ খানিক্ষণ। এ সময়ে একজন ক্রু রাতের ভাত নিয়ে আসলেন। ভাতের সাথে সবজি আর ডিম ভাজি দিয়ে গেলেন। খাওয়া শেষে সাথে নেয়া আনিসুল হকের “মা” উপন্যাসটি বের করলাম ব্যাগ থেকে। আধা-ঘন্টার মতো পড়ার পর ঘুম চলে আসলো।

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবীতে অবতরণ করতে যে ৩০ মিনিট বাকী আছে ক্রুর ঘোষণাটি শুনেই ঘুমটা ভেঙ্গেছিল মূলত। ঐ মুহুর্তে excited ছিলাম, কারণ এই প্রথম দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে অবতরণ করতে যাচ্ছি! ঠিক ৩০ মিনিট পর অর্থাৎ উড্ডয়ন করার ৫ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট আবুধাবী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো। ঘড়িতে তখন বাংলাদেশ সময় রাত ১টা বেজে ৪৫ মিনিট আর স্থানীয় সময় ১১টা ৪৫ মিনিট। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাথে আরব আমিরাতের সময়ের পার্থক্য ২ ঘন্টা। বিমান থেকে আমি, আপু এবং মামা একসাথে ইমিগ্র্যাশনে আসলাম। কিন্তু এ কী! আমার চোখের সামনে ঐ আপু এবং মামা হাওয়া হয়ে গেলেন! স্বাভাবিকভাবে মনের মধ্যে ভয় চলে আসলো কিভাবে কী করবো সেটা ভেবে। একটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে বিমান বন্দরের ভেতরে টহলরত ইমিগ্র্যাশন পুলিশের সাহায্য নিলাম। ওরা আমাকে বাতলে দিল কোন দিকে গিয়ে কী করতে হবে এবং সব কিছু সেড়ে কোন পথে বেরুতে হবে। তাদের কথা মতো সব কিছু সেড়ে ঠিকঠাক পথে বের হলাম। বিমান বন্দরের বাইরে এসে দেখলাম আমার জন্য বাবা, মেজ মামা, চাচা, চাচাতো ভাইসহ আরো অনেকে অপেক্ষা করছেন। এতজনকে দেখে আমি অবাক হলাম বটে। আমাকে রিসিভ করার জন্য এতজন আসবে সেটা ভাবিনি। কারণ বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগ মূহুর্তে ফোনে বাবা বলে দিয়েছিলেন শুধুমাত্র বাবা এবং মেজ মামা বিমান বন্দরে উপস্থিত থাকবেন আমাকে রিসিভ করার জন্য।

আবুধাবী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের একটি অংশ

বিমান বন্দরে সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করার পর সোজা হামদান স্ট্রীট-৪৬১৪৯’এ চলে গেলাম বাবা আর মামার বাসায়। বাংলাদেশ থেকে আমার মাধ্যমে দেয়া আত্মীয় স্বজনদের উপহারগুলো বাবা এবং মামাকে বুঝিয়ে দিলাম যাতে তারা প্রাপককে দিয়ে দিতে পারেন। এদিকে মামা আমার জন্য রাতের খাবার রেডি করলেন। খাওয়া দাওয়া আর টুকটাক কথাবার্তা শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। বিছানায় যখন শোবার জন্য গেলাম তখন ঘড়িতে স্থানীয় সময় ঠিক করতে গিয়ে দেখি বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে ৪টা।

(চলবে)

Advertisements

About চাটিকিয়াং রুমান

সবসময় সাধারণ থাকতে ভালোবাসি। পছন্দ করি লেখালেখি করতে, আনন্দ পাই ডাক টিকেট সংগ্রহ করতে আর ফটোগ্রাফিতে, গান গাইতেও ভালবাসি। স্বপ্ন আছে বিশ্ব ভ্রমণ করার...।।

Posted on সেপ্টেম্বর 30, 2012, in ভ্রমণ and tagged . Bookmark the permalink. 27 টি মন্তব্য.

  1. ২০০৫ সালের বর্ননা এখন! এই লেখা আপনার আরো আগে লিখে ফেলা দরকার ছিলো।

    যাই হোক শুরু টা বেশ লাগল। আশা করি আনেক কিছু জানতে পারব। তবে এখন মরুভূমি আরো অনেক পালটে গেছে। শুধু পাল্টাইনি আমরা! দুনিয়া কর আগে চলে যাচ্ছে, আর আমরা পিছিয়েই যাছি। সেইম।

    চলুক, বেশি অপেক্ষা করাবেন না।

    • কয়েক মাস আগে সামুতে ব্লগার “বড় বিলাই” আপু উনার ১৯৯৪ সালের ইরান ভ্রমণের কাহিনী লিখছিলেন ধারাবাহিকভাবে। তখন আমি ঠিক করলাম আরব আমিরাত ভ্রমণের কাহিনী ধারাবাহিকভাবে ব্লগে লিখবো। যেই কথা সেই কাজ। তাই লেখা শুরু করলাম সেই ২০০৫ সালের ভ্রমণ কাহিনী।

      আরব আমিরাত ভ্রমণের কাহিনী আসলে ২০০৬ সালে লিখেছিলাম চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত “দুর্বার” নামক একটি লিটিল ম্যাগে প্রকাশের উদ্দেশ্যে। পরবর্তী সংখ্যায় তারা ঠিকই ছাপিয়েছিল। ওটাই ছিল আমার প্রকাশিত সর্বপ্রথম লেখা।

      এই ভ্রমণ কাহিনীর শিরোনামে “মরু” শব্দটা ব্যবহার করলেও বস্তুত সেখানে মরুভূমি দেখেছিলাম একবারই! অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছে তারা সবকিছুতে! এখন অবশ্য পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে আরব আমিরাত সরকার। দুবাই’কে এখন বলা হয়- ২য় লন্ডন! আর আপনি ঠিক বলেছেন, আমরা মানুষগুলো কেমন জানি পিছিয়ে যাচ্ছি!

      ভালো থাকুন।

  2. প্রতি পর্ব আরেকটু বড় করলে মনে হয় আরেকটু ভাল হয়। আর আপনার ভ্রমণ কাহিনীর সাথেই আছি

  3. ভ্রমণ কাহিনী সব সময়ই ভাল লাগে। আরব-আমিরাত অনেক সুন্দর একটি দেশ। এখন পর্যটকদের নিত্য নতুনভাবে আকৃষ্টের জন্য কত কিছুই না করছে দেশটি। আর আমরা নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোই করে ফেলছি নষ্ট।

    অনেক ভাল লাগলো পর্বটি। অপেক্ষায় রইলাম পরের পর্বের জন্য।

    • আপনার সাথে একমত দাইফ ভাই। আমাদের এতো প্রাকৃতিক সম্পদ থাকতে আমরা সেগুলোর সদব্যবহার করতে পারছিনা। বরং সেগুলো নষ্ট করে ফেলছি। শুধুমাত্র পর্যটন খাত থেকে সরকার অনেক রাজস্ব আয় করতে পারে প্রতি বছর। অথচ আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে এর চিত্র উল্টো। এদের প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে কিছুই নেই, কিন্তু তারা আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তায় অপ্রাকৃতিককে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে রূপ দিচ্ছে!

      ধন্যবাদ আপনাকে। ভালো থাকুন।

  4. এয়ারপোর্ট দেইখা তো মাথায় ঝাক্কি মারতেসে :-P
    কবে যে বিদাশ যামু ……… :-( :-(

  5. চখামিস্টিক লেখা। চলতে থাকুক।

  6. ভালোই লাগছিলো পড়তে। তোমার সেই আপু আর মামা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন তোমাকে একলা ফেলে? পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়–

  7. ভাটি দেশের মানুষের মরু অভিজান সফল হোক

  8. আগেই পড়েছিলাম, মোবাইলে, ভাললাগা জানাতে পারিনি।
    এখন দেখলাম পরের পর্ব এসেগেছে।
    এগিয়ে যান রুমান ভাই। খুব ভাল লাগছে ভ্রমন কাহিনী।

  9. ধুর ভাইজান, এইডা কিছু হইলো?? আপনি ঘুরে আসলেন, কত্ত মজা আর অভিজ্ঞতা নিয়ে আর আমি !!! হাট্টি মাটীম এর ডিম পাড়তেছি :/

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: