মরুর বুকে বায়ান্ন দিন: ২য় পর্ব

পরের দিন সকালে মামা যখন ঘুম থেকে ডেকে দিলেন ঘড়িতে তখন সাড়ে ৮টা। ঘুম থেকে উঠার আগেই বাবা তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে গেলেন। আর মামাও প্রায় রেডি বের হওয়ার জন্য। বিছানা থেকে উঠে গোসল সেড়ে রেডি হয়ে গেলাম মামার সাথে বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। বাবা যখন দেশে থাকেন মামা তখন বাবার পুরো ব্যবসাটা দেখাশোনা করেন। আর বাবা যখন আরব আমিরাতে থাকেন তখন শালা-দুলাভাই মিলে ব্যবসাটা পরিচালনা করেন। এদিকে মামা-ভাগ্নে একসাথে বের হয়ে গেলাম পাশের একটা বাঙালি রেষ্টুরেন্টে সকালের নাস্তাটা সাড়ার জন্য। মামারা দুপুর আর রাতের খাবারটা বাসায় সাড়লেও সকালের নাস্তাটা রেষ্টুরেন্টে সাড়েন।

মামার সাথে যখন সকালের নাস্তা করছিলাম তখন ঐ রেষ্টুরেন্টের মালিক আগ্রহ নিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করলেন আমার ব্যাপারে। মামা তখন উনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে বললেন যে ২ মাসের সফরে আমি UAE এসেছি। উনি তখন স্বাভাবিকভাবে আমার একটা মিনি ইন্টারভিউ নিলেন। মানে কোথায় পড়ালেখা করেছি, পরীক্ষা কেমন হয়েছে, কোন গ্রেড প্রত্যাশা করছি ইত্যাদি। নাস্তা করা শেষে উনি আমাকে UAE’র অনেকগুলো জায়গার নাম বললেন যেগুলো দেখার মতো। জায়গাগুলোর নাম বলা শেষে আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম- কত বছর ধরে আপনি এই দেশে আছেন? উত্তরে উনি UAE’তে প্রায় ২৫ বছর ধরে আছেন বলে জানালেন। তখন আমি বললাম- আপনি নিশ্চয়ই এই সবগুলো জায়গায় ঘুরেছেন। তিনি আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে বললেন, “সেই সময় কি আছে! অনেকের কাছে এইসব জায়গাগুলো সম্পর্কে জেনেছি তাই তোমাকে বললাম আর কী! তখন আমার পাশে থাকা মামা মিটিমিটি হাসলেন। আর ভদ্রলোকটি মামাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ভাগ্নেকে অবশ্যই জায়গাগুলোতে ঘুরতে নিয়ে যাবেন।

যে রেষ্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেড়েছিলাম সেখান থেকে বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একদম কাছে। বাবার প্রতিষ্ঠানে ঢুকে দেখি কয়েকজন ক্লায়েন্টকে নিয়ে বাবা মোটামুটি ব্যস্ত। ক্লায়েন্টদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন মনে মনে ভাবলাম আগামী কয়েকদিন শুধু পরিচয় পর্বের মধ্য দিয়ে যাবে! এ দিকে মামা তার জায়গায় গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি কী করবো বুঝছিলাম না। হঠাৎ বাবার পাশের টেবিলে চালু অবস্থায় একটা কম্পিউটার খেয়াল করলাম। দেরী না করে কম্পিউটারটা গুঁতাতে বসে গেলাম। যখন দেখলাম কম্পিউটারটিতে ইন্টারনেটের সংযোগ রয়েছে তখন বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে গিয়ে সে দিনের পত্রিকা পড়তে লাগলাম।

দৈনিক প্রথম আলোর ইন্টারনেট সংস্করণ তখন এখনকার মতো ছিলো না। কাগজে যা ইন্টারনেটেও তা। অন্যান্য বাংলাদেশি দৈনিকগুলোর ওয়েব ঠিকানা জানা না থাকাতে শুধু প্রথম আলোই পড়তাম। বাবার অফিসে দৈনিক খালিজ টাইমস রাখা হতো। খালিজ টাইমস’এও চোখ বুলিয়ে নিতাম প্রতিদিনকার রুটিন হিসেবে। এভাবে প্রায় প্রতিটা দিনের সকাল থেকে দুপুর বেলাটা কাটাতাম। এছাড়া দিনের এই সময়টাতে খুব গরম পড়তো বিধায় কোথাও বের হতাম না।

আবুধাবীর সন্ধ্যা

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে যখন যোহরের আজান পড়তো তখন UAE সরকারের আইন অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, দোকান বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ রাখতে হতো বিশ্রামের জন্য। সে হিসেবে মসজিদে যোহরের নামাজ পড়ে আমরা সবাই এবং বাবার প্রতিষ্ঠানের স্টাফরা প্রত্যেকে নিজ নিজ বাসায় চলে যেতাম। বাসায় ফিরে বাবা আর মামা মিলে দুপুরের রান্নাটা সেড়ে নিতেন। এ ফাঁকে আমি টিভিতে চ্যানেল আই’এর অনুষ্ঠান দেখতাম আর বাবা-মামাকে রান্নায় টুকটাক সাহায্য করতাম। রান্না শেষ হলে একসাথে সবাই খাবারটা সেড়ে দুপুর ২টার দিকে বিশ্রাম নিতাম। এদিকে আবার সাড়ে ৩টার সময় যখন আসরের আজান পড়তো তখন বাবার প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য একসাথে বের হয়ে পড়তাম। আসরের নামাজ আদায় করে বাবার প্রতিষ্ঠানে বসতাম। তখন বিকেলের হালকা নাস্তাটাও সেড়ে নিতাম। এভাবে ১ম সপ্তাহটা কেটে গেলো।

আরব আমিরাতে যাওয়ার ২ দিন পর সেকান্দার ভাই (সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই) এলেন আমাকে দেখতে। যে সময়ে উনি এসেছিলেন সে সময়ে উনার তাড়া থাকায় অল্পক্ষণ থেকে উনার কাজে চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় কথা দিয়ে গেলেন প্রতিদিন যদি সময় পান তাহলে বিকেল বেলা আসবেন। তিনি তার কথা রাখলেন। ঠিক পরেরদিনই তিনি বিকেল বেলা উপস্থিত বাবার প্রতিষ্ঠানে। এসেই আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আবুধাবী শহরে পায়ে হেঁটে সেকান্দার ভাই আমাকে নিয়ে ঘুরলেন। এভাবে প্রতিদিন বিকেল বেলা উনার সাথে আবুধাবী শহরের আঁনাচে-কাঁনাচে ঘুরে বেড়াতাম। ৬/৭ দিন এভাবে ঘুরে বেড়ানোর ফলে শহরটা প্রায় পরিচিত হয়ে গেল আমার কাছে। কোনো কোনোদিন সন্ধ্যার আগে গন্তব্যস্থলে ফিরতাম আবার কোনো কোনোদিন সন্ধ্যার পর হতো ফিরতে।

সন্ধ্যার পর এক ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে যেতাম চিকেন স্যান্ডউইচ আর ককটেল খাওয়ার জন্য। এ ককটেল আবার বিস্ফোরক জাতীয় কিছু না। মূলত বিভিন্ন ফলের মিশ্রনে তৈরিকৃত জুস এই ককটেল। চিকেন স্যান্ডউইচের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম রীতিমত। তেমন একটা ভোজনপ্রিয় না হলেও প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চিকেন স্যান্ডউইচ খাওয়া রুটিনে পরিণত হলো।

বাবার প্রতিষ্ঠানের পাশেই ছিল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মিশরসহ আরো কয়েকটি দেশের প্রবাসীদের দোকানপাট। তাদের মধ্যে এক ইরানি প্রবাসীর কার্পেটের ব্যবসা ছিল। মাঝে মধ্যে ঐ দোকানের ষাটোর্ধ্ব মালিক উনার দোকানে আমাকে ডেকে নিয়ে যেতেন। আরবি বুঝতাম না বলে আমার সাথে ভাংগা ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করতেন। ভদ্রলোকটি ইরানের ইস্পাহানে উনার দেশের বাড়িতে যাওয়ার কয়েকদিন আগে আমাকে উনার সাথে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবাকে প্রস্তাব করে বসলেন! বাবা নিরুপায় হয়ে বিনয়ের সাথে অপারগতার কথা জানালেন। পরে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম ইরানিরা “আলী” নামটাকে বেশ শ্রদ্ধা করেন। আর আমার নামে “আলী” নামটা থাকায় আমার প্রতি উনার এতো আন্তরিকতা!

(চলবে)

মরুর বুকে বায়ান্ন দিন (১ম পর্ব)

Advertisements

About চাটিকিয়াং রুমান

সবসময় সাধারণ থাকতে ভালোবাসি। পছন্দ করি লেখালেখি করতে, আনন্দ পাই ডাক টিকেট সংগ্রহ করতে আর ফটোগ্রাফিতে, গান গাইতেও ভালবাসি। স্বপ্ন আছে বিশ্ব ভ্রমণ করার...।।

Posted on অক্টোবর 11, 2012, in ভ্রমণ. Bookmark the permalink. 28 টি মন্তব্য.

  1. আবারো দ্রুত শেষ !

    চলছে ………… চলুক।

  2. খিকজ :P ইরান থেইকা ঘুইরা আইতেন ;-)

    লিখা “সর্বোচ্চ ” পাতায় এসেছে ;-)

    ডেইলি চিকেন স্যান্ডুইচ আর ককটেল খাইয়্যা মুটা হন নাই :-P :-O

  3. চলুক। ভালো হয়েছে পড়তে পড়তে বড় পোস্টাও ছোট মনে হয়েছে।

  4. ইসসস! আরেকটু বয়স করে গেলেননা কেন ! তাহলে ইরানটাও ঘুরে আসতেন। আর আমরা নতুন কিছু জানতাম। যাহোক, যা পেয়েছি তা কম নয়। আপনাকে ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।
    পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  5. খুব ভালো লাগছে পড়তে। পরবর্তী পর্ব তাড়াতাড়ি দিও। আজকে ওয়ার্ডপ্রেসে সাইন-আপ করেছি। :)

  6. সরি দেরীতে এলাম! কিন্তু আমার অভিযোগ হচ্ছে আপনিও দেরীতে পোষ্ট দিচ্ছেন। এসব লেখায় দেরী সয় না! জলদি।

  7. পোষ্টটা প্রথম দিনেই মোবাইলে পড়েছিলাম। ব্যস্ততার কারণে কমেন্ট করতে এতো দেরী! তোমার ভ্রমণ কাহিনী পড়ে মজা পাচ্ছি। মনে হচ্ছে তোমার কাহিনীর কাছে আমার ভ্রমণ কাহিনী কিছুই না।
    ছবিটা খুব সুন্দর লাগছে। তোমার তোলা?
    ভালো থেকো, খুব।

    • আমার ভ্রমণ কাহিনী পড়ে আপনি আনন্দ পাচ্ছেন জেনে খুশি হলাম। লেখাটা বোধহয় সার্থক হলো।

      আপনি ভুল বলেছেন ভাইয়া। নিঃসন্দেহে আপনার লিবিয়া ভ্রমণ কাহিনী আমার আরব আমিরাত ভ্রমণ কাহিনীর চাইতে হাজার গুণে ভালো হচ্ছে।

      ছবিটা আমার তোলা না, ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। সেই ২০০৫ সালে এখনকার মতো ডিজিটাল ক্যামেরা available ছিল না। আপনিও ভালো থাকুন। শুভ কামনা।

  8. দেরীতে পড়বার জন্য দুঃখিত রুমান ভাই। এই ক’দিন ওয়ার্ডপ্রেসেই ঢুকিনি।
    চিকেন স্যান্ডউইচ আর ককটেল প্রতিদিন খেতেন!! সর্বনাশ, হা হা হা।
    তবে ইরান ঘুরে এলে পারতেন, চমৎকার দেশ আর ওখানকার মানুষ সত্যিই অনেক অতিথিপরায়ণ।

    ভাল লাগছে এই ভ্রমণ সিরিজটি। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

    • আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি ওয়ার্ডপ্রেসের বাইরে ছিলেন। যাক, আপনাকে দেখে অনেক ভালো লাগলো দাইফ ভাই।

      হ্যাঁ ভাই, চিকেন স্যান্ডউইচ আর ককটেল প্রতিদিন খেতাম। এটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল রীতিমত! এগুলো খেয়ে স্বাস্থ্যের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল। হা হা হা।

      ইরানের মানুষ আসলেই অতিথিপরায়ণ। কিন্তু সেই সময়ে সবে মাত্র এসএসসি লেভেল পার করার কারণে বাবা সাহস করেননি আমাকে ছাড়তে।

      ভালো থাকুন ভাই। শুভ কামনা নিরন্তর।

  9. বেশি দেরী হয়ে যাচ্ছে। পাঠক ধৈর্য হারাবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: