চাঁদনি রাতে আমরা ক’জনা

ঈদের ২য় দিন রোববার ছিল বন্ধু রানার ছোটভাই মুন্নার জন্মদিন। ছোট ভাইয়ের জন্মদিন এবং ঈদ উপলক্ষ্যে ঈদের দিনই দাওয়াত পাই প্রিয় এই বন্ধুটির কাছ থেকে। দাওয়াত পেয়ে ঈদের ২য় দিন রানার বাসায় গিয়ে মুন্নার জন্মদিন উপলক্ষ্যে ফটোগ্রাফি এবং ভোজন পর্ব শেষে কথা উঠল দূরে কোথাও হতে ঘুরে আসার জন্য। আমাদের সিনিয়র, জুনিয়র এবং বন্ধুদের যে গ্রুপটি আছে তার প্রত্যেকে পরস্পর বন্ধুর মতো এবং আন্তরিক। দুই ঈদের ছুটিতে দূরে কোথাও থেকে ঘুরে আসার ব্যাপারটা আমাদের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে অনেকটা। সে হিসেবে এই ঈদুল আযহার ছুটিতে দূরের কোনো জায়গা ভ্রমণের ব্যাপারে যখন কথা উঠল তখন কয়েকজনের সমস্যা দেখা গেল। কয়েকদিন পর কয়েকজনের পরীক্ষা, কারো ক্লাস শুরু হওয়া এবং শ্রদ্ধাভাজন সানি ভাইয়ের চাকরিতে জয়েন করার ব্যাপারটা সামনে চলে এলো। এসব কথা চিন্তা করে বন্ধু রানা প্রস্তাব করলো পরেরদিন অর্থাৎ ঈদের ৩য় দিন মুরগি দিয়ে বারবিকিউ পার্টি করার জন্য। সবাই সাথে সাথে সাড়া দিল এবং ঠিক করা হলো নির্ধারিত দিনে সন্ধ্যার আগে সিনিয়র শরীফ ভাইয়ের বাসার ছাঁদে সবাই উপস্থিত হবো।

ঈদের ৩য় দিন, সোমবার। বিকালের দিকে শরীফ ভাই ফোন দিলেন তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্য। ফোন রেখে দেরি না করে রওনা হলাম শরীফ ভাইয়ের বাসার উদ্দেশ্যে। সন্ধ্যার মিনিট পাঁচেক আগেই হাজির হলাম নির্ধারিত জায়গায়। শরীফ ভাইয়ের বাসার ছাঁদে গিয়ে দেখি বন্ধু রানা মুরগির মাংসে মসলা মাখতে ব্যস্ত। একটু পর ছোটভাই আলম, মুন্না এবং মিজান এসে হাজির। আলম আর মুন্না অবশ্য অনেক আগেই এসেছিল। বাজার থেকে মুরগি এবং কয়লা আনার ব্যাপারে ওরা সাহায্য করেছিল। আর মুরগীগুলোকে পরিস্কার করে দিয়েছিলেন শরীফ ভাইয়ের মা।

অসাধারণ সেই পূর্ণিমার চাঁদ

এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর চাঁদ তার চমৎকার রূপ দেখিয়ে আমাদের মুগ্ধ করলো। অসাধারণ ছিলো তার রূপ। এছাড়া রাতটি পূর্ণিমার রাত হওয়াতে বাড়তি আনন্দ বয়ে এনেছিল সবার মাঝে। তাছাড়া রাতের আকাশে ফানুস উড়ার দৃশ্য উপভোগ করেছি বেশ। এদিকে দেখতে দেখতে সানি ভাই, নয়ন, ওমর, তারেক সহ সবাই উপস্থিত। ছোট ভাইয়েরা মিলে দুইটা মশাল জ্বালালো যাতে পরিবেশটা আরো চমৎকার হয়ে উঠে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো এক জায়গায়। মাংস বার্ন করার জন্য চুলাতে কয়লা দেয়ার পর কোনো ক্রমে কয়লাতে আগুন ধরাতে পারছিলাম না। সবাই চেষ্টা চালিয়ে গেলাম কয়লাতে আগুন লাগানোর জন্য, কিন্তু সফল হচ্ছিলাম না। এ যেন “সাধের লাউ বানাইলি মোরে বৈরাগী”র মতো অবস্থা।

শরীফ ভাই উনার বাসা থেকে হাত পাখা নিয়ে আসলেন। অবশেষে সে হাত পাখার বাতাসের সাহায্যে কয়লাতে একটু একটু করে আগুন ধরতে লাগলো। আগুন পুরোপুরি ধরার পর হাফ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা। এবার শুরু হলো মজার পর্ব। সবাইকে একটা নির্দিষ্ট টপিকের উপর অভিনয় করে দেখাতে হবে। টপিক হিসেবে নির্ধারণ করা হলো- প্রথম প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি। অর্থাৎ সবাইকে অভিনয় করে দেখাতে হবে কে কিভাবে প্রথম প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল কিংবা দিবে। কিন্তু সমস্যা এক জায়গায়, এখানেতো সবাই ছেলে! মেয়ে ছাড়া প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি কিভাবে উপস্থাপন করে দেখাবে! তাই ঠিক করা হলো জুনিয়ররা দুইজন করে জুটি গড়ে একজন ছেলের ভূমিকায় এবং আরেকজন মেয়ের ভূমিকায় নিজেদের উপস্থাপন করবে।

প্রথমে আসলো ছোটভাই তানভি এবং মুন্নার পালা। তানভি সুদর্শন হওয়াতে সে মেয়ের ভূমিকায় থাকবে। আর মুন্নাতো ছেলের ভূমিকায় আছে। মুন্নাকে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল তখন। তাদের অভিনয় দেখে বোঝা গিয়েছিল যে বেচারা মুন্না কোনোক্রমে তার পছন্দের মেয়েটাকে প্রস্তাব দিয়ে সফল হতে পারেনি। এবার আসলো তারেক আর আলমের পালা। এক্ষেত্রে তারেক ছেলের ভূমিকার এবং আলম মেয়ের ভূমিকায়। তাদের অভিনয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেল তারা দুজনই ভালো বন্ধু এবং পরবর্তীতে তারেক তার বান্ধবীর প্রেমে পড়ে যায়। তারেক তার বান্ধবীকে প্রস্তাব দেয়ার পর তার বান্ধবী সেটা কোনোমতে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক। কারণ তারা ভালো বন্ধু হিসেবেই থাকতে চায়। কোন ধরনের প্রেমের সম্পর্কে যেতে চায় না। কিন্তু তারেক নাছোড়বান্দা। অবস্থা এমন যে, তার প্রেমের প্রস্তাব তার বান্ধবীকে গ্রহণ করতেই হবে। শেষমেশ সে তার বান্ধবীকে ১ সপ্তাহের সময় দেয় বিষয়টি সম্পর্কে ভেবে দেখার জন্য। ১ সপ্তাহ পর যখন তারেকের বান্ধবী প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করলো তখন তারেক বেশ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল তার বান্ধবীর সামনে। কিন্তু এরই মাঝে ধরা পড়ে যায় তারেকের পূর্ব প্রেমের ঘটনা। অর্থাৎ সে তার আগের প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তার বান্ধবীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইছিলো মূলত।

জুনিয়রদের পর্ব শেষে এবার এলো সিনিয়রদের পালা। প্রথমে শরীফ ভাইয়ের পালা। উনি উনার প্রেমের প্রস্তাবের ঘটনাগুলো নিজেই উপস্থাপনা করলেন সবার মাঝে। উনার কাছ থেকে জানা গেল কিভাবে উনি তিন তিনটি প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। সেই তিনটির মধ্যে একটি ঘটনা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। ঘটনাটির জন্য উনি নিজেও অনুতপ্ত। এখনো ব্যাপারটিকে তিনি অনুভব করেন। আসলে প্রেম করার আগে কিংবা কাউকে ভালোবাসার আগে পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারগুলো চিন্তা করে শরীফ ভাই মেয়েটির প্রস্তাব ফেরত দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটি তা মেনে নিতে পারেনি। চির অভিমানী মেয়েটি আর কোনোদিন শরীফ ভাইয়ের দিকে একটি বারের জন্যও তাকায়নি, একটি মূহুর্তের জন্যও শরীফ ভাইয়ের সামনে আসেনি!

শরীফ ভাইয়ের কাছ থেকে উনার ঘটনাগুলো শোনার পর এবার আসলো শাহিদ ভাইয়ের পালা। উনি সাবলীলভাবে বললেন উনার প্রথম প্রেমে পড়ার কাহিনী। কিভাবে একজন স্পোর্টসম্যান থেকে তিনি পুরোদস্তুর প্রেমিক হয়েছিলেন তা আমাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। এরপর আসলো সানি ভাইয়ের পালা। উনি উনার বেশ কয়েকটি মজার অতীত স্মৃতির কথা বলে আমাদের বেশ হাসালেন। অবশ্য সবাইকে হাসাতে উনি উস্তাদ। শরীফ ভাই, শাহিদ ভাই এবং সানি ভাইয়ের পর হঠাৎ খেয়াল করলাম ছোটভাই নয়ন বাদ পড়েছে। তাই জোর করে তাকে সবার সামনে দাড় করিয়ে দেয়া হলো। ওর ঘটনা শুনে মনে হলো বেচারা প্রেমের চাইতে বইকে বেশি আপন মনে করে। শুধুমাত্র পরীক্ষার দোহাই দিয়ে সে একটি মেয়ের ডাকে সাড়া দেয়া থেকে বিরত থেকেছিল। যা হোক, সবার পালা শেষে এবার এলো আমার পালা। কিন্তু ততক্ষণে চিকেন বারবিকিউ রেডি। দেরী করলে খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে এই দোহাই দিয়ে আমি পার পেলাম।

কারো জিহ্বায় জল এলে আমি দায়ী নই!

পরোটা দিয়ে চিকেন বারবিকিউ পরিবেশিত হলো। অসাধারাণ ছিল স্বাদ। এই অসাধারণ স্বাদের জন্য সব কৃতিত্ব বন্ধু রানার প্রাপ্য। ও না থাকলে এমন স্বাদের চিকেন বারবিকিউ খাওয়া হতো না। আর শরীফ ভাই যদি সার্বিকভাবে সহায়তা না করতেন তাহলে এমন সুন্দর আয়োজন সম্ভব হতো না।

সিনিয়র শরীফ ভাই এবং বন্ধু রানা

খাওয়া দাওয়া মোটামুটি শেষ হলো। এদিকে আমার মুখ থেকে কিভাবে আমার প্রেম কাহিনী বের করানো যায় এই ইস্যুতে ছোটভাই নয়ন বেশ সরব। অবশেষে আমার পালা আসলো। আমার কাহিনী বললাম সবাইকে। যদিও শরীফ ভাই এবং রানা আমার ব্যাপারগুলো অনেক আগে থেকে জানে। সবার শেষে বন্ধু রানাকে বলতে বাধ্য করা হলো। কারণ সে তার ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার বেশ সুযোগ খুঁজছিল। যদিও সে প্রেম-ভালোবাসা থেকে নিরাপদ দূরত্বে আছে।

সবার প্রাণবন্তকর উপস্থাপনা, চিকেন বারবিকিউ’র অসাধারণ স্বাদ, পূর্ণিমার রাত এবং ফানুস উড়ানোর দৃশ্য সব মিলিয়ে পরিবেশটা খুবই চমৎকার ছিল। ঈদের ছুটিতে সবাইকে কাছে পেয়ে অনেক ভালো লেগেছে আসলে। প্রত্যাশা করি এমন সুন্দর সময় বারেবার আসুক। সিনিয়র, জুনিয়র, বন্ধুবর সবার জন্য রইলো অশেষ শুভ কামনা।

পোস্ট উৎসর্গঃসিনিয়র শরীফ ভাই এবং বন্ধু রানা’কে।

Advertisements

About চাটিকিয়াং রুমান

সবসময় সাধারণ থাকতে ভালোবাসি। পছন্দ করি লেখালেখি করতে, আনন্দ পাই ডাক টিকেট সংগ্রহ করতে আর ফটোগ্রাফিতে, গান গাইতেও ভালবাসি। স্বপ্ন আছে বিশ্ব ভ্রমণ করার...।।

Posted on অক্টোবর 31, 2012, in বিবিধ and tagged , . Bookmark the permalink. 37 টি মন্তব্য.

  1. Vai….. sei rokom ekta raat chhilo, r tomar sabolil lekhay aro pranobonto hoye uthechhe lekha gulo :)

  2. বারবিকিউ পার্টি মিস করলাম :( :(

    আমার এসব ভালো লাগে । ওই রাতে আমরা কয়েকজন ছাদে আড্ডা দিয়েছি । গল্প করেছি ।

    নেক্সট পার্টি তে দাওয়াত দিতে হবে >:(

  3. সবুজ মোহাইমিনুল

    DUTS এর রানা ভাইয়ের সাথে সুন্দরবন টুরে গিয়েছিলাম ….দারুণ মানুষ তেমনি গানের গলা

    • রানার সাথে আপনার পরিচয় আছে জেনে খুশি হলাম। আসলে সে দারুণ মানুষ। আমার প্রিয় বন্ধু। গতবছর আগষ্টের দিকে DUTS’এর কক্সবাজার ট্যুরে আমি ছিলাম। ঐ ট্যুরের সুবাধে DUTS’এর অনেকের সাথে পরিচয়, এরই সাথে ঘনিষ্ঠতা।

      ভালো থাকুন সবুজ ভাই।

  4. গত বছর আমরাও ক্যাম্পাসে পাহাড়েস ঢালে বার্বিকিউ পার্টি করেছিলাম B-)
    এইবারের চাঁদ টা আসলেই ব্যাপক সুন্দর । অবশ্য আমরা হইলাম গিয়া সিঙ্গেল মানুষ , এইটা নিয়া রোমাঞ্চিত হওয়ার চান্স নাই এখন :( :P

  5. আহা! চোখের সামনে দিয়ে সবাই কত মজা করে বারবিকিউ খায়……পেট ব্যাথা করে না ভাই? এভাবে আমাদের ফেলে খেতে পারলে…

    চমৎকার একটা বর্ণনা। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো সেই রাতে যদি আমিও থাকতে পারতাম………

  6. সবাই মিলে অনেক মজা করেছিলে সেদিন। যদিও আমি সেদিনই রাতে শুনেছিলাম সব। এমন সুন্দর সময় বারেবার ফিরে আসুক তোমাদের মাঝে। :)

  7. এই হচ্ছে রিয়েল আড্ডা। আড্ডার সব কিছুই ছিল।
    হা, এমন আড্ডা দিতে কলিজায় জোর লাগে।

  8. হে হে হে,
    বাহ বাহ, সেইরকম জ্বালোয়া দেখাইছেন… আড্ডার মাঝখানে হারিয়েই গিয়েছিমা প্রায়, প্রাণবন্ত উপস্থাপনা :)

  9. চমৎকার একটা পোস্ট। নিট এন্ড ক্লিন পোস্ট! ভালা পাইলাম!

  10. কেমন আছেন রুমান ভাই?
    ভাল লাগছে পোস্ট পড়ে…

  11. সুন্দর লেখা – মনে হল আমি নিজে আপনার আড্ডা তে হাজির ছিলাম।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: