ফিরে দেখা ডিসেম্বর: ৩য় পর্ব

এই পর্বে থাকছে ৭১’এর ৯ ডিসেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাপুঞ্জ।

৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১

একাত্তরের এই সময়ে দ্রুত মুক্ত হতে থাকে একের পর এক জায়গা। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে টিকতে না পেরে পাক হানাদার বাহিনী পিছু হঠতে থাকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তানের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ সময়ে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করার পদক্ষেপ নেয়। আজকের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার ৭ম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দিতে আদেশ দেন। উদ্দেশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। কারণ বীর সন্তানদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।

মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে যে সমস্ত জায়গাগুলো শত্রুমুক্ত হয় তাদের মধ্যে অন্যতম হলো- দাউদকান্দি, গাইবান্ধা, কপিলমুনি, ত্রিশাল, নকলা, ঈশ্বরগঞ্জ, নেত্রকোনা, পাইকগাছা, কুমারখালী, শ্রীপুর, অভয়নগর, পূর্বধলা, চট্টগ্রামের নাজিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা।

দাউদকান্দি শত্রুমুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত মেঘনার সম্পূর্ণ পূর্বাঞ্চল মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। এর আগে কুমিল্লা মুক্ত হওয়ার খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে দাউদকান্দির মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিবাহিনীর হামলায় টিকতে না পেরে পাক হানাদার বাহিনী ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়।

৭১ এর এই দিনে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মুক্তিবাহিনী সকাল ১১টার দিকে শহরের চারিদিকে অবস্থান নেয়। এর ফলে পাক হানাদারদের এ দেশীয় এজেন্ট আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই খবর পেয়ে জেলা শহরে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্রুত এসে কুমারখালী শহর ঘিরে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। মুক্তিবাহিনী আবারো পাল্টা হামলা চালিয়ে রাজাকার, আল-বদর, আশ-শামস বাহিনীর ক্যাম্প ঘিরে ফেলে এবং অতর্কিত হামলা চালালে পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে পাক হানাদার মুক্ত হয় ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও নড়াইল। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে ভারতীয় যুদ্ধবিমান বোমা হামলা চালায়। এরই সূত্র ধরে পাকিস্তানের অন্যতম সহযোগী চীন সেনা মোতায়েন করে সিকিম-ভুটান সীমান্তে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করার উদ্দেশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নির্দেশে বঙ্গোপসাগরে রওনা হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম নৌবহর মালাক্কা প্রণালীতে অবস্থান নেয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমা হামলা ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে পাকিস্তান।

১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের এই সময়ে চারিদিক থেকে মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের খবর আসতে থাকে আর একের পর এক জায়গায় পাকিস্তান বাহিনী নাস্তানাবুদ হতে লাগলো। আজকের এই দিনে কুষ্টিয়া পাক হানাদার মুক্ত হয়। ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুষ্টিয়ায় অবস্থান নেয়। কিন্তু ১ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে কুষ্টিয়া। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল ভেড়ামারায় এক যুদ্ধে পাক বাহিনী আবারো দখলে নেয় কুষ্টিয়া শহর। অবশেষে আজকের এই দিনে কুষ্টিয়া শত্রুমুক্ত হয়।

মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকা মুক্ত করতে থাকে। এই দিন মিত্রবাহিনী হিলি সীমান্তে ব্যাপক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। সন্ধ্যার দিকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় শক্তিশালী পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের ঘাঁটির উপর তীব্র আক্রমণ চালায়। সারারাত ধরে চলতে থাকে যুদ্ধ। যৌথবাহিনীর প্রচন্ড হামলার মুখে ঠিকতে না পেরে অবশেষে ভোরের দিকে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

এদিকে ইয়াহিয়া খান মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাহায্য কামনা করেন। কিন্তু নিক্সন থাকেন নীরব। কারণ সারা বিশ্ব এটা ভালোভাবে বুঝতে পারে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বিদেশী নাগরিকরা যাতে ঢাকা ত্যাগ করতে পারে সে উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের বিশেষ অনুরোধে যৌথবাহিনী এই দিন সকালে ঢাকায় সাময়িকভাবে বিমান হামলা বন্ধ রাখে।

১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর পরাজয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্টের সাহায্যের জন্য মুখিয়ে থাকে। আর অন্যদিকে তাদের মিত্র সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ১২ ডিসেম্বরের আগের দিন অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর রাশিয়ার ওয়াশিংটন প্রতিনিধিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার সাবধান করে দিয়ে বলেন, “আগামীকাল ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করাতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

পরেরদিন অর্থাৎ ১২ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ বক্তব্য দেয়ার পর উক্ত অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। অন্যদিকে ৯ই ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে বঙ্গোপসাগরে রওনা দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম নৌবহর এই দিন বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ২৪ ঘন্টার দূরত্বে গভীর সমুদ্রে এসে অবস্থান নেয়।

৭১ এর এই দিনে বুদ্ধিজীবি হত্যার নীল-নকশা তৈরি করা হয়। সেই দিন রাতে প্রাদেশিক সরকারের বেসামরিক উপদেষ্টা মেজর রাও ফরমান তাদের এ দেশীয় দোসর আল-বদর ও আশ-শামসের কেন্দ্রীয় অধিনায়কদের সদর দফতরে ডেকে পাঠান। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এক গোপন বৈঠক। এই গোপন বৈঠকে বুদ্ধিজীবি হত্যার নীল-নকশা প্রণয়ন করা হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান তাদের হাতে বুদ্ধিজীবিসহ বিশেষ বিশেষ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নামের তালিকা তুলে দেন। এই নীল-নকশা অনুযায়ী একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা হয় জাতির মেধাবী সন্তানদের।

মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে এ.পি.আই. এর জেনারেল ম্যানেজার বিশিষ্ট সাংবাদিক নিজামউদ্দিনকে আল-বদর বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের দোসরা যখন নিজামউদ্দিনের বাসায় হানা দিয়েছিল তখন তিনি বিবিসি’র জন্য রিপোর্ট তৈরি করছিলেন। ঐ অবস্থায় ধরে নিয়ে গিয়ে আল-বদর বাহিনী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

১৯৭১ সালের এই দিনে সকাল বেলায় শত্রু মুক্ত হয় নরসিংদী। দিনাজপুরের বিরল থানার বহলা গ্রামে এই দিন পাক হানাদার বাহিনী এক নৃশংস গণহত্যা চালায়। ১২ই ডিসেম্বর ঐ গ্রামে পাক বাহিনীর একটি দল অনুপ্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে টিকতে না পেরে পাকিস্তান বাহিনী এক পর্যায়ে বহলা গ্রামে ঢুকে পড়ে। এ সময় তারা গ্রামবাসীদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেয়। গ্রামবাসীরা গ্রাম ছেড়ে যাবার জন্য যখন প্রস্তুতি নেয় তখন পাকিস্তান বাহিনী আবার তাদেরকে একত্রিত হবার নির্দেশ দেয়। ঐ মূহুর্তে মাগরিবের নামাজের সময় হয়। অনেকে মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য নামাজের কাতারে দাঁড়ান। সবাই যখন নামাজের কাতারে দাঁড়ালেন তখন পিছন দিক থেকে ব্রাশ ফায়ার করে পাক হানাদার বাহিনী। তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে শহীদ হন ৩৭ জন। মাত্র কয়েকজন গ্রামবাসী সেদিনের নৃশংস গণহত্যা থেকে রেহাই পান।

Advertisements

About চাটিকিয়াং রুমান

সবসময় সাধারণ থাকতে ভালোবাসি। পছন্দ করি লেখালেখি করতে, আনন্দ পাই ডাক টিকেট সংগ্রহ করতে আর ফটোগ্রাফিতে, গান গাইতেও ভালবাসি। স্বপ্ন আছে বিশ্ব ভ্রমণ করার...।।

Posted on ডিসেম্বর 9, 2012, in মুক্তিযুদ্ধ. Bookmark the permalink. 7 টি মন্তব্য.

  1. খুব ভাল লাগ্ল…ধন্যবাদ…

  2. বিশ্ব রাজনীতির ব্যাপারটা আরেকটু বিস্তারিত বললে ভালো হতো না?
    এই লেখা লিখে খুব ভালো কাজ করেছ।

  3. অসাধারণ চিন্তাশীলতার পরিচয়।
    আপনার প্রতি অনেক শুভকামনা।

  4. আপনার লেখা ভাল লাগলো – এসব ইতিহাস অনেকেই জানে না, আশা করি এসব বাংলাদেশের স্কুলে পরান হয় থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সেনার অবদান কিছু কম ছিল না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: