বিদায় ভূমি! স্বাগতম স্বদেশ!

১৯৪৬’এর Great Kolkata Killing নামে পরিচিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ফলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মি. ক্লেমেন্ট রিচার্ড এটলি হিন্দু-মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে ব্যারিস্টার মি. রেডক্লিপকে ভারত ভাগের বাউন্ডারি কমিশনের প্রধান বানিয়ে উপমহাদেশে পাঠান। যিনি কিনা এর আগে কখনো ভারতে আসেননি এবং ঐ সময়ের এ অঞ্চলের প্রশাসনের কাউকে চিনতেন না। এমনকি ভাইসরয় মাউন্টবাটেনের কাছ থেকে তিনি দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন! তবে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ক্রিস্টফার বিউমন্ট প্রশাসনের অনেকের সাথে পরিচিত ছিলেন। তাছাড়া সীমানা নির্ধারণ উত্তর ভারতজুড়ে সংঘাতের কারণে রেডক্লিপ তাঁর পারিশ্রমিক ৪০ হাজার রুপি (৩ হাজার পাউন্ড) প্রত্যাখান করেন। পরবর্তী কর্মজীবনে তিনি প্রিভি কাউন্সিলের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হন।

মি. রেডক্লিপ ভারত-পাকিস্তানের জন্য সীমানা নির্ধারণ করলে পরে উভয় দেশের সীমানা ঘেঁষে কিছু কিছু অপদখলীয় এলাকা সৃষ্টি হয়। অপদখলীয় জায়গা বলতে-কিছু এলাকায় ভারতীয় লোকজন পড়ে যায় বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান ভূখন্ডের মধ্যে। আবার পূর্ব পাকিস্তানের কিছু জায়গার জনগণ পড়ে যায় ভারতীয় ভূখন্ডের মধ্যে। রেডক্লিফ বাউন্ডারি কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী এমন কিছু জমি ভারতের সীমানার ভিতরে পড়েছে যে ভূমিতে দখলে আছেন পাকিস্তানি জনগণ। কিছু ভূমি পাকিস্তান সীমানার ভিতরে আছে, অথচ দখলে আছেন ভারতীয় লোকজন। পরবর্তীতে এ দখল এভাবেই থেকে যায়। এটাই অপদখল। আর এসব ভূমি নিয়েই এক একটি ছিটমহল।

এই ছিটমহলগুলোর মধ্যে যেগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আছে সেগুলোর মালিকানা ভারতের। ভারতের অভ্যন্তরে যে সমস্ত ছিটমহলগুলো আছে সেগুলোর মালিকানা বাংলাদেশের। এ রকম ছিটমহল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আছে ১১১টি যার মোট আয়তন ১৭১৫৮.১৩ একর আর ভারতের সীমানার মধ্যে আছে ৫১টি ছিটমহল যার মোট আয়তন ৭১১০ একর।

১৯৭৪ সালের ১৬ই মে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মাঝে স্থল সীমানা চুক্তি সাড়ম্বরে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের ভিতরে ছিটমহলবাসী বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যাবে, ভারতের ভিতরে ছিটমহলবাসী ভারতের নাগরিক হয়ে যাবে। এটাই ছিলো এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। অপদখলীয় ভূমি কিংবা ছিটমহলগুলোতে যারা পূর্বপুরুষদের কাল হতে বসবাস করে আসছেন ব্যক্তি হিসেবে জমির মালিকানা তাদের। দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের উচ্ছেদ করে ১৯৭৪ সালে আবার ৪৭’এর মতো উদ্বাস্তু সমস্যা সৃষ্টি করে মানুষগুলোকে অমানবেতর অনিশ্চিত জীবন যাপনের দিকে ঠেলে না দেয়ার জন্য এই চুক্তি। যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন, শুধু মালিকানা বিনিময় হয়ে যাবে দু’টি দেশের মাঝে। আর জমির পরিমাণ নিয়ে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়- জমি বেশি হোক কিংবা কম হোক, এর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ কোনো দেশ দাবি করবে না।

১৯৭৪ সালে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ২০১৫ এর ৩১শে জুলাই মধ্যরাতে ১৬২টি ছিটমহল দুই দেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের অর্থাৎ যেগুলো এখন থেকে বাংলাদেশের ভূখন্ড হিসেবে বিবেচিত হবে সেগুলোর ৪১ হাজার ৪৪৯ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। ৯৭৯ জন গ্রহণ করেছেন ভারতের নাগরিকত্ব, এরা ১লা আগস্ট থেকে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে যেকোনো সময় ভারত চলে যেতে পারবেন। এছাড়া ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল অর্থাৎ যেগুলো এখন থেকে ভারতের ভূখন্ড হিসেবে বিবেচিত হবে সেগুলোর কেউই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি। এদের সবাই ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তির পর থেকে দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহলের নাগরিকত্বহীন মানুষ নিজেদের পরিচয়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছিলেন। অধিকার আদায়ের দীর্ঘ যাত্রার পর ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই’এর মধ্যরাত ছিটমহলবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মূহুর্ত। ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়েছে এই সময়ে। এ রাতটি ছিটমহলবাসীর জন্য উৎসবের রাত। ক্লান্তিহীন আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল তারা ঘরে তুলেছে ৩১ জুলাই মধ্য রাতে। এরপর বাংলাদেশের ভূখন্ডে তারা ছিটমহলবাসী হিসেবে নয়, তারা পরিচয় পেলেন শুধু বাংলাদেশি হিসেবে, হয়ে গেছেন বাংলাদেশি, পেয়েছেন এই সুজলা সুফলা বাংলাদেশকে। বিদায় জানালেন এতদিনকার ভূমিকে! স্বাগতম জানালেন স্বদেশকে!

Advertisements

About চাটিকিয়াং রুমান

সবসময় সাধারণ থাকতে ভালোবাসি। পছন্দ করি লেখালেখি করতে, আনন্দ পাই ডাক টিকেট সংগ্রহ করতে আর ফটোগ্রাফিতে, গান গাইতেও ভালবাসি। স্বপ্ন আছে বিশ্ব ভ্রমণ করার...।।

Posted on জুলাই 31, 2015, in বিবিধ and tagged , . Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: